এম.মনছুর আলম,চকরিয়া :কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতদলের সদস্যদের গ্রেফতার অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসী হামলায় সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন (২৩) হত্যা মামলায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে পাঁচজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়াও অন্য চার আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। নির্দোষ প্রমাণিত বা সম্পৃক্ত না থাকায় পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব ডুমখালী এলাকার জাফর আলমের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন, আবদুল মালেকের ছেলে নাছির উদ্দিন, আবুল কালাম কবিরাজের ছেলে মোর্শেদ আলম এবং একই ইউনিয়নের রিংভং ছগিরশাহ কাটা এলাকার মৃত কামাল হোসেনের ছেলে নুরুল আমিন। তৎমধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি মোর্শেদ আলম পলাতক রয়েছেন।
বুধবার (২০মে) দুপুর ১২টার দিকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর এ রায় দেন।
মামলার অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম চৌধুরী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনা শেষে আদালত এ রায় দিয়েছেন। একই সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি অস্ত্র মামলারও রায় দেয়া হয়েছে। সেই মামলায় ১৩ আসামিকে দুটি পৃথক ধারায় ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। হত্যা মামলাটির মতো ওই মামলায়ও পাঁচ আসামি খালাস পেয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে চকরিয়ার উপজেরার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় ডাকাতি প্রতিরোধ অভিযানে গিয়ে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছারোয়ার নির্জন। এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ১৭ জনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতিসহ হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে একই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেন। দীর্ঘ ৪ মাস তদন্ত শেষে গত বছরের ১৯ জানুয়ারি ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন-চকরিয়া পৌরসভার কাহারিয়াঘোনা এলাকার নুরুল কবিরের ছেলে জালাল উদ্দিন, ভরামুহুরী এলাকার মো. আনোয়ার হাকিম, চকরিয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের উচিতার বিলের মৃত শহর মুল্লুকের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ডুলাহাজারা পূর্ব মাইজপাড়া এলাকার মোজাফফর আহমদের ছেলে জিয়াবুল করিম, নুরুল আলমের ছেলে মো. ইসমাইল হোসেন, মৃত নুরুল আলমের ছেলে এনামুল হক, পূর্ব ডুমখালী এলাকার মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ এনাম, রংমহল এলাকার নুর আলমের ছেলে মো. কামাল, ছগিরশাহ কাটা এলাকার গোলাম কাদেরের ছেলে আবদুল করিম। অস্ত্র মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জনসহ ১৩ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুই মামলায় খালাস পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন- উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের উচিতারবিল এলাকার মো: খাইরুজ্জামানের ছেলে মো: ছাদেক, চকরিয়া পৌরসভার পূর্ব পালাকাটা এলাকার জালাল উদ্দিনের ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম, একই এলাকার ছৈয়দ আহমদের শাহ আলম, মৃত ইব্রাহিম খলিলের ছেলে আবু হানিফ, বান্দরবানের লামা উপজেলার অংশাংঝিরি এলাকার আবদুল জলিলের ছেলে মিনহাজ উদ্দিন। সেনা কর্মকর্তার এই ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম চৌধুরী বলেন, হত্যা মামলায় বাদীপক্ষে ৫২ জন সাক্ষী ছিলেন। তাঁদের আসামিপক্ষ জেরা করেছে। অন্যদিকে অস্ত্র মামলায় ৪৬ জন সাক্ষী ছিলেন, আসামিপক্ষে ৭ জন সাফাই সাক্ষী দিয়েছেন। আদালত সবকিছু পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল এহেছান জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমাজে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ রায় যুগান্তকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। মামলার রায় ঘোষণার সময় ১৮ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে তিনজন কারাগারে। মোর্শেদ আলম নামের একজন পলাতক।
সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজিম ছারোয়ার নির্জনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তিনি ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেছিলেন।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার আদালত অঙ্গনে সকাল থেকে ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। রায় ঘোষণার পর দণ্ড পাওয়া আসামিদের কড়া পাহারায় পাঠানো হয় কারাগারে

0 Comments